Wednesday, November 1, 2017

সয়ে গেছে অন্ধকার - গল্প





অালো থেকে বেরিয়ে হঠাৎ অন্ধকারে চোখ রাখলে প্রথম প্রথম কিছুই দেখা যায় না । কিন্তু সেই অন্ধকারে কিছুক্ষণ কাটিয়ে দিতে পারলে চারদিকটা অাগের তুলনায় অনেকটা দৃশ্যমান হয় । তাই বলে কি এই অন্ধকার সেই অালোর থেকে উত্তম? হ্যা, উত্তম ধরেই অামরা মানুবজাতি অাজ অন্ধকার জগতকেই বেছে নিয়েছি । ভুলে গিয়েছি অালোর জগত অার সয়ে গেছে অন্ধকার । অন্ধকারে যতটুকু দৃশ্যমান হয় তারচেয়ে হেয়ালি অার প্রতারণা থাকে বেশি । ঝুলিয়ে থাকা পরিত্যক্ত কাপড়কে দেখলে মনে হয় কে যেনো দাঁড়িয়ে অাছে, দূরের কাকতাড়ুয়া দেখলে মনে হয় ভূত, রাস্তায় পড়ে থাকা পাঁকানো দঁড়ি দেখলে মনে হয় সাপ । অন্ধকারে অালোর স্বর্গময় পৃথিবী হয়ে যায় দেও-দানবের পাতালপুরী । দিনের অালোতে যে রাস্তা ধরে অনায়াসে মাইলের পর মাইল চলে যাওয়া যায় সেই চিরচেনা রাস্তা উঁচুনিচু তোয়াক্কা না করেই রাতের অাঁধারে অনুমানে চলতে হয় । ফলে কদমে কদমে থাকে হোঁচট খাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা । এটা তো প্রায় সময় হয়, সাইকেল নিয়ে রাতের অন্ধকারে অালোর অভাবে পাশের নর্দমায় পড়ে গিয়েছে সাইকেল অারোহী; কখনোবা পথিকের গায়ে লাগিয়ে দিয়েছে । পরিণামদর্শীতা জেনেও অনুমান কখনোই বিজ্ঞান হতে পারে না, দিনের অালোর ন্যায় স্পষ্টতা হতে পারে না । কিন্তু সেই অনুমানকেই অামরা সিদ্ধ সূত্র হিশেবে অন্ধবিশ্বাস করে চলেছি; কদমে কদমে হোঁচট খাচ্ছি অার মাঝে মাঝেই পঁচা নর্দমায় শোনা যাচ্ছে অালোহীন মানুষগুলোর লম্ফঝম্ফ ।

অালো দেখলে মানুষগুলো অাজ বড্ড ভয় পায় । কারণ সে অালোর ঝলকানিতে তারা একদিন ধ্বংসলীলা দেখেছে । সেদিন সে অালো ঝলসিয়ে দিয়েছে কত প্রাণের সজীবতা । অালোকজ্ঞানের দাম্ভিকতায় জোরপূর্বক উত্তরাধিকারসূত্রে যাদের হাতে অালোক প্রদীপটি এসে পড়েছিলো তারা নিজের স্বার্থে সে অালোর করেছে বারবার অপব্যবহার । মানুষগুলোর সহজ-সরল বিশ্বাসের সুযােগ নিয়ে প্রতারণা করেছে বারবার । পথ দেখানোর নামে, সুন্দর পৃথিবী দৃশ্যমানের প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে সেদিন ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে ডাকাতি করেছে, পুড়িয়ে মেরেছে কত প্রাণ । সেদিন দেখেছে মানুষ অালোর অপব্যবহারের বীভৎস রূপ ! এখন রাতের অন্ধকারে জোনাকির অালোটাও বড্ড ভয় লাগে । বড্ড ভয় পায় মানুষ দিনের অালো । তাই অালোর পৃথিবী থেকে নির্বাসন নিয়ে অন্ধকার জগতে অবতরণ করেছে । এ গ্রহটায় যখন পা রাখে প্রথম প্রথম কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না । কিন্তু কিছুক্ষণ কাটানোর পর মানিয়ে নিতে পেরেছে সবাই । সয়ে গেছে অন্ধকার । অন্ধকার এ গ্রহে অন্ধকারালয়ে জ্বলেনা কোনো প্রদীপ - মানব দেখেনা মানবীর রূপ, মানবী দেখেনা মানবের রূপ । হাতড়িয়ে যতটুকু সুখ পাওয়া যায় তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয় । কিন্তু এতে করে দিনে দিনে নিজের ভিতর পশুত্বই বেড়ে চলেছে । অনুমানে চলতে হয় বলে রাতের অন্ধকারে সন্দেহ অনেক । ছোটদের মনে ভূত-প্রেত, দেও-দানবের ভয় অার বড়দের ভয় ওটা বুঝি অনিষ্টকর মানুষ । কতবার অনুমানে অার সন্দেহে অাত্ম-নিরাপত্তার জন্য বর্শা ছুঁড়েছে, গুলি করেছে - তার ইয়ত্তা নেই । কাছে গিয়ে স্পষ্ট হয়েছে এ যে তারই সহোদর ! অাদরের ভাইয়ের বুক থেকে তখন রক্ত পড়ছে । কিন্তু অন্ধকারে রক্তের রং যে লাল নয়, কালো । হ্যা, এভাবেই মানুষগুলো দিনে দিনে পশুতে পরিণত হচ্ছে । অন্ধকার জগত, সুস্পষ্টতার অভাবে কে কার অন্ন ধ্বংস করলো, কে কার স্ত্রীকে নিজের স্ত্রী মনে করে জড়িয়ে নিয়ে শুয়ে পড়লো এটা নিয়ে অাজকাল কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না । সেটার সুযোগ অাছে? অন্ধকার তো, কেউ কি কাউকে চিনতে পারছে । অার কাছে গিয়ে চিনতেও চায় না । পাছে বেঁচে থাকার বিশ্বাস ভেঙ্গে যায় । ঐটুকুনই তো বাকি অাছে ।

কেটে গেলো সহস্র বছর । এ গ্রহের ইতিহাস হয়েছে বীভৎস থেকে বীভৎসতর । মানুষগুলোর পঞ্চইন্দ্রিয় ঠিকই অাছে । শুধু বোধটুকুন, যুক্তিটুকুন লোপ পেয়েছে । বর্তমান প্রজন্ম ভুলে গিয়েছে তাদের পূর্বপুরুষ একসময় অন্যগ্রহের বাসিন্দা ছিলো, যে গ্রহে অালো ছিলো । অামি তাদের অালোর গল্পই বা শুনাচ্ছি কেনো? অালো দেখতে কেমন এটা কি এরা জানে? কল্পনা করতে পারবে? কল্পনায় কতদূর যাওয়া যায় । যা কখনোই দেখা হয় নি, সেটা কি কল্পনায় দেখা সম্ভব? অনুভব করা সম্ভব? অাজন্ম অন্ধ কি পেরেছে কল্পনায় লাল-নীল-সবুজ রঙ্গ অাঁকতে? সে জেনেছে ঘাসের রং সবুজ কিন্তু সেই সবুজ অাসলে কী, কেমন - এটা কি সে কল্পনায় বুঝতে পেরেছে? অন্ধকার গ্রহের এ প্রজন্মও কল্পনা করতে পারেনা অালো কী, কেমন । সেটা সম্ভবও নয় । তাই বলে কি অালো সত্য নয়, এই অন্ধকারই সত্য? তাদের কাছে তাই । কারণ, তারা যুক্তি বুঝেনা, তাদের বোধশক্তি নেই ।

দীর্ঘ অনেকটা সময় জীবিকা অন্বেষণের পর এ গল্পের নায়ক-নায়িকা দুজন শুয়ে অাছে একটা কুঁড়েঘরে । তাদের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে তবে তাতে যেনো কোনো রাখঢাক নেই । অশ্লীল নাকি শ্লীল, রাগান্বিত নাকি উচ্ছ্বসিত কোনোটাই বুঝা যাচ্ছিলো না । কারণ অন্ধকারে দূর থেকে তাদের মুখ ও ঠোঁটের ভাঁজ দেখা সম্ভব নয় । একটু পর দুর্বোধ্য শব্দগুলো ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছিলো । এ ঘরে ও ঘরে, অাশেপাশে সবখানে সবাই এবার খুব জোরে সােরে চেচামেচি করছে । সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে এলো । সব জড় হয়ে গিয়েছে । দূর থেকে একটা অালো ক্রমশ বড় হচ্ছে । মনে হচ্ছে সেটা এদিকেই অাসছে । সবাই ভয়ে অারো জোরেসোরে শব্দ করছে । ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যারা বড়দের সাথে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিলো তারা ভয়ে ঘরে চলে গেলো । কারণ, ছোটবেলা থেকেই তারা এই দানবের কথা শুনে অাসছে, এটা অনেক ভয়ানক জিনিস । সব ধ্বংস করে দেয়, সব ঝলসিয়ে দেয়, সব অঙ্গার করে দেয় । যদিও তারা ঝলসানাে অার অঙ্গার জিনিসগুলো জানেনা । তবে তারা জানে তীব্র শীতের হাড়কাঁপানো শৈত্য । এরকম কিছু যেটা তার চাইতে অারো প্রবল এমনটি কল্পনা করে তারা ভয় পায়, তাদেরকে ভয় পাওয়ানো হয় । অালোটা এবার অনেক কাছে চলে এসেছে । প্রায় কাছে অাসতে পরিষ্কার হলো সোনালী মুখের একজন মানুষকে, যার হাতে একটা অালোর মশাল । অালোর মশালে অল্পসময়ের জন্য অাশপাশটা অালোকতি করে ফেললো কিন্তু সেটা খুব অল্প সময়ের জন্য । এরই মধ্যে তাকে টার্গেট করে বৃষ্টির ন্যায় পাথর নিক্ষেপ । যে নিয়ে এসেছিলো অালো সে অার বেশিক্ষণ এখানে টিকতে পারলো না । দৌড়ে চলে গেলো । হয়তো শরীরের অনেকাংশে রক্ত ঝড়ছিলো কিন্তু সেটা তো অার এরা দেখতে পায় নি, এরা রক্ত চিনে না, রক্তের রং লাল সেটা এরা জানেই না । অন্ধকার পাড়া জুড়ে অনেকক্ষণ গুঞ্জণ শোনা যাচ্ছিলো । একসময় নীরব হয়ে গেলো । সবাই ঘুমাতে গেলো ।

পরের প্রজন্মের জন্য নতুন একটা গল্প যোগ হলো । এই ঘটনাটি সে গল্পে নতুন মাত্রা পেলো । মা তাদের সন্তানদের, দাদা-দাদী তাদের নাতি-নাতিনদের বলতে শুরু করলো, "সে অালোয় অামরা অামাদের রূপ দেখতে পেয়েছিলাম । অামরা কিন্তু এরকম নই । গায়ের রঙ সে কি অপূর্ব ! অাগে কখনো দেখিনি । তবে একটা জিনিস খারাপ লেগেছিলো । অালোর চারপাশে যারা ছিলো তাদের শরীরে অনেক ক্ষত দেখা গিয়েছিলো । বোধহয় হোঁচট খাওয়ার দাগ, যেখানে সেখানে কেটে যাওয়ার দাগ ।" গল্প শুনে ছোট ছেলেমেয়েরা শিহরিত হতো, যে স্বপ্ন দেখা তাদের পূর্বপুরুষরা ভুলেই গিয়েছিলো তারা এবার স্বপ্ন দেখা শুরু করলো, অপূর্ব গায়ের রঙ্গ কল্পনা করতো । যদিও সেই অালোর মশালবাহীকে হিংস্র, দেও-দানবের সন্তান বলে গল্পে তুলে ধরা হতো, তবু কি করে জানি এ প্রজন্মটা তাকে স্বপ্নের নায়ক, বীর বলেই বুকে জায়গা দিয়ে দিয়েছিলো । এভাবেই বড় হচ্ছে প্রজন্ম । তারা যে স্বপ্নের জাল বুনে যাচ্ছে সে জালেই হয়তো একদিন ধরা পড়বে সত্যটা । এরাই একদিন তাদের জগতটা অালোকিত করবে । অন্ধকার থেকে বেরিয়ে অাসবে অালোর জগতে । কথাগুলো ভাবছিলো পাহাড়ের ওপাশের অালোর বাসিন্দা, যে একসময় অালোর মশাল নিয়ে তাদের সামনে যেতেই তোপের মুখে পড়তে হয়েছিলো । সে শুধু চেয়েছিলো তারা শুধু একবার অালো দেখুক । ব্যস, এতোটুকুই । সে স্বপ্ন পূরণ হয়েছে তবে তার দুটো পায়ের বিনিময়ে । পাথরের অাঘাতে অনেক ক্ষত হয়েছিলো । তারপর পঁচন ধরেছে । শেষ পর্যন্ত পা দুটোই হারাতে হয় । এতোকিছু হারানোর পরেও তার মুখে স্বপ্নাতুর হাসিটা লেগেই অাছে । ঠোঁটের দৃঢ়তায় তার অটুট অাত্মবিশ্বাস স্পষ্ট প্রতীয়মান ।

ইলিয়াস অাহমেদ
রংপুর, বাংলাদেশ 
৯.০৬.২.১৬ 

0 comments:

Post a Comment

Contact Us

Name

Email *

Message *